এসএসসিতে ফেল করা শিক্ষার্থীদের করণীয় কী
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশজুড়ে আনন্দ-উল্লাসের পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীর মনে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া। প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় কম।
পরীক্ষায় পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। বিপরীতে অকৃতকার্য হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন।
দেশে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া বা আশানুরূপ ফল না করার কারণে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক অবসাদে ভোগে। প্রতিবছরই ফল প্রকাশের পর আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নেওয়ার খবর পাওয়া যায়, যা উদ্বেগজনক।
তবে শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানীরা বারবার মনে করিয়ে দেন, একটি পরীক্ষার ফল কখনোই কারো জীবনের চূড়ান্ত যোগ্যতা কিংবা শক্তি-দুর্বলতা নির্ধারণ করতে পারে না। এটি সামগ্রিক শিক্ষাজীবনের একটি ছোট্ট অংশ মাত্র।
কেন অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা ঘটে
শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অনিয়মিত পড়াশোনা, পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে তাড়াহুড়া করে প্রস্তুতি নেওয়া, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপ।
সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে অকৃতকার্য হওয়া মানেই একজন শিক্ষার্থী অযোগ্য বা মেধাহীন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অর্থ হতে পারে শিক্ষার্থীর পড়াশোনার পদ্ধতিতে ঘাটতি ছিল। তাই এই নেতিবাচক মানসিকতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনা জরুরি।
হতাশা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর উপায়
মানসিক চাপ সামলে পুনরায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পড়াশোনায় ফিরতে কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আবেগ সামলে নেওয়া : মন খারাপ হওয়া বা হতাশ লাগা স্বাভাবিক।
নিজের আবেগ জোর করে চেপে না রেখে তা প্রকাশের জন্য নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া উচিত।
ভুল থেকে শিক্ষা : আগের ফল এড়িয়ে না গিয়ে নিজের ভুলগুলো মূল্যায়ন করতে হবে। সিলেবাস অসম্পূর্ণ থাকা বা পর্যাপ্ত মডেল টেস্ট না দেওয়ার মতো বিষয়গুলো ফল খারাপ হওয়ার কারণ হতে পারে। ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ না করে দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান : কোনো একটি বিষয়ে ‘আমি খারাপ’—এমন ধারণা না করে ঠিক কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে হবে। এরপর সেই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য পরিকল্পনা করতে হবে।
মানসিক চাপ কমানো : অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা প্রস্তুতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ধ্যান, যোগব্যায়াম বা প্রশান্তিদায়ক গান শোনার মাধ্যমে মন শান্ত রাখা যেতে পারে।
সহযোগিতা নেওয়া : সব চাপ একা বহন করার প্রয়োজন নেই। শিক্ষক, অভিভাবক, বড় ভাইবোন কিংবা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বললে মানসিক চাপ অনেকটাই কমতে পারে।
পড়াশোনায় মনোযোগ ফেরাবেন যেভাবে
পড়াশোনায় নতুন করে মনোযোগ ফেরাতে এবং আগামী পরীক্ষার জন্য ভালো প্রস্তুতি নিতে একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পড়ার রুটিন তৈরি করা জরুরি। যে বিষয়গুলোতে ফল আশানুরূপ হয়নি বা দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশি সময় দিতে হবে।
মূল পাঠ্যবই গভীরভাবে পড়ার পাশাপাশি বিগত বছরের প্রশ্নপত্র সমাধান এবং ঘড়ি ধরে মডেল টেস্ট দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে লেখার গতি বাড়ার পাশাপাশি পরীক্ষার সময় ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং পরীক্ষাভীতি কমাতে সহায়তা করবে।
টানা পড়াশোনা না করে মাঝে মাঝে ছোট বিরতি নেওয়া মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। পড়াশোনার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দিতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিক প্রস্তুতিই ভবিষ্যতে ভালো ফলাফলের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
ফেল মানেই জীবনের শেষ নয়
পরীক্ষায় ফেল করা মানেই জীবনের শেষ নয়। বরং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে বিষয়গুলো আরো ভালোভাবে বোঝার এবং নিজের ভিত্তি মজবুত করার এটি একটি সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর কৌশল ও পরিবারের ইতিবাচক সমর্থন থাকলে ব্যর্থতাকেও সাফল্যের সিঁড়িতে পরিণত করা সম্ভব। জীবনের এই পথচলায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
.jpg)
No comments