ঘুষের টাকা আগে, সরকারি সেবা পরে!
জমির রেকর্ড, পরচা কিংবা মৌজার নকশা—সরকারি ফি পরিশোধ করেই এসব সেবা পাওয়ার কথা। তবে নাটোর সদর উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে সেবা নিতে এসে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা। অভিযোগ, টাকা না দিলে ফাইল পড়ে থাকে দিনের পর দিন, আর ঘুষ দিলে দ্রুত এগিয়ে যায় কাজ।
এনপিবির অনুসন্ধানে অফিসের এক পেশকারের বিরুদ্ধে কাজ করে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে পেশকার আনন্দ কুমারকে একজন সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে টাকা নিতে দেখা যায়। একইসঙ্গে অফিসের এক পিয়নের বিরুদ্ধেও সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাটোর সদর উপজেলার বড়হরিশপুর মহল্লার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন হরিশপুর মৌজায় নিজের জমির রেকর্ড সংক্রান্ত কাজ নিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে সেটেলমেন্ট অফিসে ঘুরছেন বলে জানান। তার অভিযোগ, ঘুষ না দেওয়ায় দীর্ঘদিনেও তার কাজ শেষ হয়নি।
ইসমাইল হোসেনের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর তার সঙ্গে সেবাগ্রহীতা সেজে সেটেলমেন্ট অফিসে যান এনপিবি প্রতিবেদক। এ সময় কাজ করে দেওয়ার কথা বলে পেশকার আনন্দ কুমার ২০ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে। পরে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাকি টাকা তার ‘স্যার’ অফিসে এলে দিতে হবে বলেও তিনি জানান।
পরে টাকা নেওয়ার বিষয়ে আনন্দ কুমারকে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে তিনি নিজের পকেট থেকে টাকা বের করে দেখান। একইসঙ্গে বিষয়টিকে ভুল হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে অভিযোগ শুধু পেশকার আনন্দ কুমারের বিরুদ্ধে নয়। একই অফিসের পিয়ন জাহানারা বেগমের বিরুদ্ধেও রয়েছে টাকা নেওয়ার অভিযোগ। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কথোপকথনে তিনি দাবি করেন, সেটেলমেন্ট অফিসে কাজে আসা ব্যক্তিরা তাকে খুশি হয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে দিয়ে যান। এছাড়া ৫ লাখ টাকা মূল্যের জমির রেকর্ড নিজের নামে নিতে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন।
সেটেলমেন্ট অফিসে সেবা নিতে আসা আরও কয়েকজনের সঙ্গেও কথা বলে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের অভিযোগ, টাকা না দিলে একই কাজের জন্য বারবার অফিসে আসতে হয়। আর টাকা দিলে দ্রুত কাজ এগিয়ে যায়।
বিষয়টি নিয়ে নাটোর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ উদ্বেগজনক। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী বিভাগীয় সেটেলমেন্ট অফিসার মো. আরিফ হোসেন জানান, বিষয়টি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা। তবে অনুসন্ধানে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা অর্থ লেনদেনের দৃশ্য এবং একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগে নাটোর সদর উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের সেবা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

No comments