শিরোনাম

১০৭ বছর পর মিলল আটলান্টিকের তলে হারিয়ে যাওয়া যুদ্ধজাহাজ

চ্যানেল টেন ডেস্কঃ

১৯১৮ সালের এক ধূসর সন্ধ্যা। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের উপকূলের দিগন্তে আবছা আলোয় একটি জাহাজের অবয়ব ফুটে উঠতেই পেরিফেরি দিয়ে লক্ষ্য স্থির করলেন এক জার্মান সাবমেরিন ক্যাপ্টেন। তার তাৎক্ষণিক নির্দেশে গর্জে উঠল একটি মাত্র টর্পেডো। সেই টর্পেডোর আঘাতে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেল ‘ইউএস কোস্ট গার্ড কাটার টামপা’।

মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে ১৩১ জন আরোহী নিয়ে আটলান্টিকের অতল গভীরে হারিয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজটি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য এ ঘটনা ছিল বড় শোকের অধ্যায়।

এরপর কেটে গেছে ১০৭ বছর। ইতিহাসের পাতায় বন্দি থাকা সেই বিয়োগান্তক ঘটনার সাক্ষী খুঁজতে সমুদ্রের নীল জলরাশিতে চলেছে নিরন্তর অনুসন্ধান। অবশেষে গত সপ্তাহে অবসান ঘটল সেই দীর্ঘ অপেক্ষার। কর্নওয়াল উপকূল থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে, সমুদ্রের ৩০০ ফুট গভীরে ব্রিটিশ ডুবুরিদের একটি দল খুঁজে বের করেছে টামপার সেই ধ্বংসাবশেষ।

বুধবার (২৯ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে এই আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করেছে।

ধ্বংসাবশেষটি খুঁজে বের করেছে যুক্তরাজ্যের গ্যাসপেরাডোস ডাইভ টিম। ফেসবুক পেজের তথ্য অনুযায়ী, তারা একটি স্বেচ্ছাসেবক টেকনিক্যাল-ডাইভিং দল, ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের সঙ্গে মিলে যুক্তরাজ্যের আশপাশে ডুবে যাওয়া জাহাজের সন্ধান করে থাকে দলটি। ২০২৩ সাল থেকে টামপার খোঁজ করছিল এই দল।

ডাইভ টিমের নেতা স্টিভ মর্টিমার ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘তিন বছরের গবেষণা এবং অনুসন্ধানের ফল এই আবিষ্কার। টামপা যুক্তরাষ্ট্র এবং সেদিন যারা মারা গিয়েছিলেন তাদের স্বজনদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবশেষে তাদের শেষ বিশ্রামের স্থানটি জানা গেল।

অন্য এক পোস্টে তিনি বলেন, টামপা খুঁজে পাওয়া কেবল গত সপ্তাহের ঘটনা নয়। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু ধরে এটি ছিল আমাদের দশম ডাইভ ট্রিপ। স্কিপার (ছোট জাহাজ), ক্রু, গবেষক বা ডুবুরি—সবাই এ আবিষ্কারে ভূমিকা রেখেছে। আমরা খুবই আনন্দিত। আমরা এটি আবিষ্কার করতে পেরেছি!

যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, ধ্বংসাবশেষটি যে টামপারই ছিল তা নিশ্চিত করতে তারা দলটিকে বিভিন্ন রেকর্ড এবং তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে।

কোস্ট গার্ড আটলান্টিক অঞ্চলের ইতিহাসবিদ উইলিয়াম থিসেন এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডের দেওয়া তথ্যে জাহাজটির ডেকের সাজসজ্জা, চাকা, ঘণ্টা, অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াও টামপার পুরোনো আর্কাইভের ছবি সংযুক্ত ছিল।

টামপার শেষ যাত্রা

যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড অন্য এক নথিতে টামপার শেষ যাত্রার বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

১৯১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাহাজটি আটলান্টিক জলসীমায় কনভয় (পাহারাদার জাহাজ দল) ডিউটি শুরু করে। কিন্তু ২৬ সেপ্টেম্বর টামপার ক্যাপ্টেন কনভয় ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি চান। কারণ তার জাহাজের বয়লার চালানোর জন্য কয়লা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। এর ফলে দ্রুত পুনরায় জ্বালানি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

কমান্ডাররা ক্যাপ্টেনের অনুরোধ মঞ্জুর করেন। নির্দেশনা অনুযায়ী, জাহাজটি বিকেল ৪টার দিকে পূর্ণ গতিতে ওয়েলসের একটি বন্দরের দিকে রওনা হয়।

রাত তখন ৮টা ১৫ মিনিট। ওই সময় জার্মান সাবমেরিন ইউবি-৪১ টামপাকে দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে জার্মান ক্যাপ্টেইনের নির্দেশে একটি টর্পেডো নিক্ষেপ করা হয় টামপা লক্ষ্য করে।

কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, টর্পেডোর বিস্ফোরণের পরপর একটি সেকেন্ডারি বিস্ফোরণ ঘটে। ধারণা করা হয়, এই বিস্ফোরণ খুব সম্ভবত কয়লার ধুলায় আগুন লেগে অথবা টাম্পায় থাকা ডেপথ চার্জ (ডুবোজাহাজ বিধ্বংসী বোমা) ফেটে যাওয়ার কারণে হয়েছিল।

পরে টামপা গন্তব্যে না পৌঁছালে একটি বিমানকে সন্ধানে পাঠানো হয়। পরদিন ধ্বংসাবশেষের কিছু অংশ পাওয়া যায়।

জাহাজটিতে ১১১ জন কোস্ট গার্ড সদস্য, ৪ জন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-সেনা এবং ১৬ জন ব্রিটিশ (রয়্যাল নেভি কর্মী ও বেসামরিক নাগরিকসহ) ছিলেন।

হারিয়ে যাওয়া সেই কোস্ট গার্ড সদস্যরা আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ ছিলেন, যাদের মধ্যে রাশিয়া ও নরওয়ে থেকে আসা অভিবাসীরাও ছিলেন।

কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে ১১ জন ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ। তারাই ছিলেন যুদ্ধে নিহত হওয়া প্রথম সংখ্যালঘু কোস্ট গার্ড সদস্য।

কোস্ট গার্ড কমান্ড্যান্ট অ্যাডমিরাল কেভিন লুন্ডে এক বিবৃতিতে বলেন, ১৯১৮ সালে যখন টামপা তার সকল সদস্যসহ নিখোঁজ হয়, তখন তা আমাদের বাহিনীর জন্য এক গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বহু বছর পর ধ্বংসাবশেষটি খুঁজে পাওয়া আমাদের তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তারা আরও একবার মনে করিয়ে দিল, কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা চিরস্থায়ী।

যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, তারা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও রোবটিক ব্যবহার করে ধ্বংসাবশেষটি আরও বিশদভাবে খোঁজার পরিকল্পনা করছে।

সূত্র: সিএনএন ।

No comments