ঈদের আনন্দের আড়ালে বৃদ্ধাশ্রমে জীবনের আর্তনাদ বাবা-মায়ের
চ্যানেল টেন ডেস্কঃ
দেশজুড়ে যখন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মাতোয়ারা সব শ্রেণিপেশার মানুষ, ঠিক তখনই গাজীপুরের মনিপুর হোতাপাড়ার গিভেন্সী গ্রুপ পরিচালিত বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভিন্ন এক চিত্র। উৎসবের উচ্ছ্বাস সেখানে থমকে গেছে চার দেয়ালের ভেতর।
এই কেন্দ্রে থাকা শতাধিক প্রবীণের বড় একটি অংশ বছরের পর বছর সন্তানদের সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন। ঈদের মতো বড় উৎসবেও তাদের খোঁজ নিতে আসেন না অধিকাংশ সন্তান। কেউ কেউ ফোন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রাখেন না।
কথায় আছে, বাবা মানে মাথার ওপর তপ্ত রোদে বটবৃক্ষের শীতল ছায়া, আর মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম পরিহাসে সেই, জান্নাত আজ অবহেলিত ঠিকানায়।
ঈদের সকালে যেখানে নাতি-নাতনি আর সন্তানদের কোলাহলে ঘর মুখর থাকার কথা, সারা দেশে যখন নতুন পোশাকে শিশুদের কোলাহল সেখানে এই প্রবীণ নিবাসে বিরাজ করছে এক পিনপতন নীরবতা তখন এই কেন্দ্রের বারান্দায় বসে থাকা বাবা-মায়েদের চোখে কেবল অপেক্ষা। রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকা সেই দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকে একটাই প্রশ্ন আজ কি আসবে আমার সন্তান?
একাধিক প্রবীণের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই এক সময় সমাজে প্রতিষ্ঠিত পরিবারের কর্তা ছিলেন। কারো সন্তান প্রকৌশলী, কারো মেয়ে প্রবাসে। কিন্তু কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক অজুহাত কিংবা সম্পর্কের টানাপড়েনে তারা আজ স্থান পেয়েছেন এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
মনিপুর বৃদ্ধাশ্রমের হোস্টেল সুপার মোহাম্মদ হাবিবা খন্দকার বলেন, আমরা পরম মমতায় তাদের সেবা করার চেষ্টা করি। নতুন পোশাকে তারা সেজেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই উজ্জ্বল রঙের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ধূসর বিষাদ। সন্তানের ফোন এসেছিল কিনা, বার বার একি প্রশ্ন তারা আমাকে করে যায়।
তিনি বলেন, আমরা সবসময় চেষ্টা করি তাদের মুখে হাসি ফোঁটানোর। নতুন এক পরিবার গড়ে তুলেছি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এই মানুষগুলোকে নিয়ে। এখন একে অপরের পরমাত্মীয়। একে অপরের দুঃখ ভাগ করে নিতে নিতেই কাটছে তাদের নিঃসঙ্গ জীবন।
ষাটোর্ধ পাখী বেগম, যিনি এক সময় শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন, জানান সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের সবকিছু দিয়েছি। এখন তারা ব্যস্ত আমি তাদের জন্য বোঝা। তার মতো আরও অনেকের কণ্ঠে একই সুর অভিমান বেদনা আর না বলা প্রশ্ন।
কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে নতুন পোশাক ও বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হলেও অধিকাংশ প্রবীণের মুখে ছিল না প্রত্যাশিত আনন্দ। বরং দিনভর তারা জানতে চেয়েছেন আমার ছেলের ফোন এসেছে কিনা।
নগরায়ণ একক পরিবার ব্যবস্থা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে দিন দিন বাড়ছে প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা। এই বাস্তবতা শুধু আবেগের নয়, একটি বড় সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। যেখানে একসময় বাবা-মা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে এখন অনেকেই হয়ে পড়ছেন অপ্রয়োজনীয়। ঈদের আনন্দ যখন সাময়িক, তখন এই প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা দীর্ঘস্থায়ী। উৎসব শেষে আলো নিভে গেলে, তাদের জীবনে থেকে যায় কেবল নীরবতা আর দীর্ঘশ্বাস।
প্রশ্নটা এখন ব্যক্তিগত নয় সমিষ্টিক আমরা কি এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি যেখানে বাবা-মা হয়ে উঠবেন অবহেলার প্রতীক? সময় এখনও আছে।আজকের এই অবহেলা, আগামী দিনের প্রতিচ্ছবি। এবারের ঈদের অঙ্গীকার হোক কোনো বাবা-মায়ের শেষ আশ্রয় যেন আর বৃদ্ধাশ্রম না হয়।
No comments