শিরোনাম

৭৬১ কোটি টাকা ঋণখেলাপির তকমা নিয়েই ত্রয়োদশ নির্বাচনে কাজী রফিক


বগুড়া প্রতিনিধিঃ

জনসেবার অঙ্গীকার নিয়ে আবারও ভোটের মাঠে নেমেছেন সাবেক সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম। তবে তার পিছু ছাড়ছে না ‘ঋণখেলাপি’র তকমা। তবে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে রাজি নন কাজী রফিকুল ইসলাম। 

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের শত শত কোটি টাকা বছরের পর বছর অনাদায়ী রেখে তিনি বর্তমানে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি–সোনাতলা) আসনের ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। 

রাজনৈতিক প্রভাব ও আদালতের স্থগিতাদেশের আড়ালে এতদিন খেলাপি পরিচয় চাপা থাকলেও, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতে কঠোর নজরদারি তার নির্বাচনী ভাগ্যে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—৭৬১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়ে তিনি কি আদৌ সংসদে যাওয়ার যোগ্য?

সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, কাজী রফিকুল ইসলাম ও তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে দুই ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের কাছে তার গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৪৮৪ কোটি টাকা এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কাছে ২৭৭ কোটি টাকা।

দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পরিশোধ না করায় তাকে উভয় ব্যাংকের শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব ঋণ আদায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে বলেও জানিয়েছে সূত্র।

ব্যাংক ও আদালতের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কাজী রফিকুল ইসলাম ‘ওকে গ্রুপ’-এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ২০০৯ সালে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪০ কোটি টাকা ব্যক্তিগত ঋণের মাধ্যমে তার ব্যবসায়িক লেনদেন শুরু হয়। 

পরবর্তীতে একাধিক দফায় ঋণ বাড়িয়ে ২০১৩ সালের মধ্যে তা দাঁড়ায় ৮০ কোটি টাকায়। বর্তমানে সুদ-আসলসহ ওই ব্যাংকের পাওনা ২৭৭ কোটি টাকা, যা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ঋণ পরিশোধ না করায় গ্রাহকের বিরুদ্ধে ‘সিআর-৩৮৭২/২৪’ নম্বরের মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে খেলাপি হিসেবে সিআইবিতে নাম দেখানো ঠেকাতে তিনি আদালত থেকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (স্টে অর্ডার) নিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি তথ্য অনুযায়ী, কাজী রফিকুল ইসলামের নামে ব্যক্তিগতভাবে দুটি খেলাপি ঋণ রয়েছে—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ২৭৭ কোটি টাকা এবং এক্সিম ব্যাংকে ৭৭ কোটি টাকা। একইসঙ্গে তার মালিকানাধীন ‘ওকে প্রপার্টিজ’-এর নামে এক্সিম ব্যাংকে আরও ২০৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। সবগুলো ক্ষেত্রেই আদালতের স্থগিতাদেশ নেওয়া হয়েছে।

এক্সিম ব্যাংক সূত্র জানায়, ‘ওকে গ্রুপ’-এর নামে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ‘ওকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’, ‘ওকে এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’ ও ‘ওকে প্রপার্টিজ’-এর নামে পৃথকভাবে ঋণ রয়েছে।

এদিকে, বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় রাজনৈতিক ও ব্যাংকিং অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনের জন্য আইনগতভাবে অযোগ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দলের উচিত নয় একজন ঋণখেলাপিকে প্রার্থী করা। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। প্রার্থীর নৈতিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি জানিয়েছেন, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলেও এখন সিআইবিতে খেলাপি হিসেবেই তথ্য দেখানো হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সিআইবিতে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তি জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার যোগ্য নন।

উল্লেখ্য, কাজী রফিকুল ইসলাম ২০০১ সালে বিএনপির মনোনয়নে বগুড়া-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

বিষয়টি নিয়ে কাজী রফিকুল ইসলামের সাথে কথা বলতে চাইলে অজুহাত দিয়ে বলেন, আমি কোন কথা বলতে চাই না।

No comments