শিরোনাম

ধান সংগ্রহে অনিয়ম তদন্তে কচ্ছপগতি, খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার শাস্তি দাবি

চ্যানেল টেন ডেস্কঃ

কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠনের পর এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রতিবেদন জমা হয়নি। এমনকি তদন্তের অগ্রগতি ও অনিয়মের অভিযোগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন- এমন অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট ভারপ্রাপ্ত খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার (ওসিএলএসডি) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মঙ্গলবার দুপুরে রাজারহাট প্রেস ক্লাবের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সরকারি খাদ্যগুদামে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কথা। এর ফলে কৃষকরা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এড়িয়ে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ পান। কিন্তু রাজারহাটে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, ধান সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন মাঠপর্যায়ের প্রকৃত কৃষকরা। সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ না পেয়ে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজারে কম দামে ধান বিক্রি করেন। এতে একদিকে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে সরকারের কৃষকবান্ধব খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হয়।

বক্তারা বলেন, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে কৃষক নির্বাচন থেকে শুরু করে ধান গ্রহণ, ওজন, মান যাচাই, রেজিস্টারে তথ্য সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণ—প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে শুধু মৌখিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে কৃষকের তালিকা, ধান সংগ্রহের রেজিস্টার, টোকেন, চালানসহ সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র পরীক্ষা করতে হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহে অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযোগ তদন্তে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ধান-চাল সংগ্রহ কমিটির সভাপতি তানজিলা তাসনিম জানিয়েছিলেন, অভিযোগ তদন্তে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

তবে কমিটি গঠনের পর এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। ফলে তদন্ত কমিটি আদৌ কী কী বিষয় যাচাই করেছে, কার কার বক্তব্য নিয়েছে এবং অভিযোগের কতটুকু সত্যতা পাওয়া গেছে এসব বিষয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

এ নিয়ে স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগের তদন্ত যদি দীর্ঘ সময়েও শেষ না হয়, তাহলে অনিয়মের অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কীভাবে?

তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. এমদাদুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘দু-তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’

তবে এর আগে এক মাসের মতো সময় পেরিয়ে গেলেও কেন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, তদন্ত যেন দীর্ঘসূত্রতায় না পড়ে এবং নিরপেক্ষভাবে পুরো বিষয়টি যাচাই করে দ্রুত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে গিয়ে যদি প্রকৃত কৃষকরাই বঞ্চিত হন তাহলে সরকারের ধান সংগ্রহ কর্মসূচির সুফল কারা পাচ্ছেন, এ প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।

তারা আরও বলেন, অভিযোগের তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে সেটিও তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্পষ্ট করা উচিত। এতে কৃষকদের মধ্যে আস্থা ফিরবে এবং সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের অবসান হবে।

তদন্তের সবশেষ অগ্রগতি ও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ জানতে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা তাসনিমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে রাজারহাট খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি)-এর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকেও পাওয়া যায়নি।

এদিকে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কৃষক ও স্থানীয়রা দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তাদের দাবি, শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলেই হবে না; তদন্ত দ্রুত শেষ করে প্রতিবেদন জনসম্মুখে আনতে হবে। একই সঙ্গে ধান সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়া পুনরায় যাচাই করে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে ধান সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত যদি এক মাসেও শেষ না হয়, তাহলে কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হবে কীভাবে? তাই তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

No comments