দুই মন্ত্রণালয়ের ঠেলাঠেলি
হরি বচ্চন (৫০)। ‘অবৈধ অনুপ্রবেশের’ দায়ে ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। আদালত হরিকে ৬ মাসের সাজা দেয়। ২০১৩ সালের ১৩ মে তার সাজার মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছরের মতো অতিরিক্ত সাজা খাটছেন তিনি।
গ্রেপ্তারের সময় হরি পুলিশকে জানিয়েছিলেন, তার বাবার নাম ভান বচ্চন। তিনি ভারতের ভুপাল প্রদেশের সিহোর জেলার লুনাগাঁওয়ের বাসিন্দা। সাজা শেষে নিয়ম অনুযায়ী হরিকে ফেরত নিতে ভারতীয় দূতাবাসকে অবহিত করে কারা অধিদপ্তর। ভারতীয় দূতাবাস উল্লেখিত ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে হরির পরিবারের কারও সন্ধান না পেলে তাকে ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানায় ভারত সরকার। শুধু ঠিকানা জটিলতার কারণে কারা অভ্যন্তরে জীবনযাপন করছেন। এবং দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
একই অপরাধে ২০১৯ সালের ১৪ মে খুলনার লবণচরা থানা পুলিশ পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার দিনহাটা থানার আজমঘর গ্রামের বাসিন্দা পার্বতীকে (৫৫) গ্রেপ্তার করে। পার্বতীর ৭ দিনের সাজা হয়। সেই মাসেরই ২৫ তারিখে তার সাজার মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু মুক্তিপ্রাপ্ত পার্বতী সেই থেকে এখনো হরির মতো বন্দিদশায় রয়েছেন। একই কারণে তাকেও ফেরত নিচ্ছে না ভারত সরকার। ফলে ৭ বছর ধরে অতিরিক্ত কারাবাস করে যাচ্ছেন পার্বতী।
শুধু হরি কিংবা পার্বতীর বেলায় নয় ২০০১ সালে গ্রেপ্তার হওয়া মিয়ানমারের আলিনাথপাড়ার বুচিডং এলাকার বাসিন্দা আবু তাহের (৪০), ২০২২ সালে গ্রেপ্তার হওয়া আসামের জাকড়াপাড়ার বাসিন্দা সানোয়ার হোসেন (৩১) এবং ২০২৪ সালে গ্রেপ্তার হওয়া নাইজেরিয়ান নাগরিক চিছম পর চুন ওদুধোয়ার (৩০) সাজার মেয়াদ ৬ মাস শেষ হলেও এখনো কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের মতো বিভিন্ন দেশের ১৫৭ নাগরিক সাজা শেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় কারাগারে জীবনযাপন করছেন। অবৈধ অনুপ্রবেশ, পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায়, মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকাসহ বিভিন্ন অপরাধে বিভিন্ন সময়ে তাদের গ্রেপ্তার করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব বন্দিকে তাদের দেশ ফেরত নিতে নারাজ। ফলে কারাবন্দি বিদেশিরা মানসিক ট্রমায় ভুগছেন। আবার সাজা শেষেও মুক্তি না পাওয়ায় এবং নিজ দেশে ফিরে যেতে না পারায় কারাগারে ‘বিদ্রোহ’ করার চেষ্টা করছেন। শুধু তাই নয়, এমন জটিলতায় হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে আছে ৩ বিদেশির মরদেহও।
এসব বিদেশি বন্দিকে তার নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করে থাকে। দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে। অথচ এক মন্ত্রণালয় আরেক মন্ত্রণালয়কে দোষারোপ করছে। জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (বহিরাগমন-১ শাখা) কাজী আরিফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক দেশ নিজ থেকে তাদের নাগরিককে নিয়ে যায়। আবার অনেক দেশ নিতে চায় না। দূতাবাসও সাড়া দেয় না। এসব বিদেশি বন্দিকে দিতে পারলে আমাদেরই ভালো হয়। তবে এ কাজটা বেশি করতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। আমরা তো শুধু বিদেশি বন্দির ঠিকানাসহ তালিকা দিতে পারি। বাকি কাজটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।
অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দোষারোপ করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (মিয়ানমার অনুবিভাগ) মো. তৌফিক-উর-রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভুল ঠিকানার কারণেই বিদেশি বন্দিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশি বন্দির সঠিক ঠিকানাসহ যাবতীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করলে এর সুরাহা সম্ভব। বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তারকালে পুলিশের উচিত কাগজপত্র দেখে নাগরিত্ব যাচাই করা। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি যে দেশের নাগরিক বলে দাবি করেছে, সে আসলেই ওই দেশের নাগরিক কিনা, তা শুরুতেই যাচাই করলে সাজা শেষে তাকে সহজে তার দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব। এবং সংশ্লিষ্ট সেই দেশের দূতাবাস তথা সরকারও তাকে নিতে বাধ্য। তিনি বলেন, নিয়মের বাইরে গিয়ে জোর করে তো কোনো নাগরিককে ফেরত পাঠানো যায় না। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়। তবে নাগরিকত্ব চিহ্নিত হওয়ার পরও কোনো দেশ তার নাগরিককে নিতে না চাইলে তখন ‘আন রিজন’ হিসেবে বিষয়টি ফাইল বন্দি থাকে। অন্যদিকে ওই নাগরিককে না নেওয়া পর্যন্ত আলোচনা চলতে থাকে।
বিদেশি বন্দি রয়েছেন, এমন কয়েকটি কারাগারের জেল সুপাররা জানান, ভারতের অনেক রাজ্যের বাসিন্দারা বাংলায় কথা বলতে পারেন। আবার অনেকে বাংলাদেশি আসামিদের সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকতে থাকতে বাংলা ভাষা শিখে গেছেন। এ কারণে এদের ফেরত নেওয়ার কথা এলেই ভারতীয় দূতাবাস টালবাহানা করে। বলে, এরা বাঙালি। বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারে। তাদের নাগরিক নয়। তারা আরও জানান, সাজা শেষ হওয়ার পরও অতিরিক্ত সাজা ভোগের ফলে এসব বন্দি মানসিক ট্রমায় ভুগছেন। এদের কেউ কেউ কারাগারে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করছেন, গ্রুপিং করছেন। আবার জায়গা স্বল্পতার কারণে দেশীয় বন্দিদের কারাগারে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর ওপর বিদেশি বন্দিরা বছরের পর বছর থাকছেন। এ ছাড়া এদের বাবদও সরকারি বাজেট রাখতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে অল্পসংখ্যক হলেও বিদেশি এসব বন্দি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতের এক আদেশের পর ১৫৭ বিদেশি বন্দির তালিকা আদালতে প্রেরণ করে কারা অধিদপ্তর। আদালতের আদেশের পরও এ বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি।
কারাগারে আছেন ৩৮২ বিদেশি
কারা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোতে মোট (৩০ এপ্রিল পর্যন্ত) ৩৮২ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন। আর সাজা শেষে মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা ১৫৭ জন। এর মধ্যে ১৯ জন নারী বন্দিও রয়েছেন। বন্দিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ভারতের নাগরিক। এই সংখ্যা ২২০ জন। মিয়ানমারের ১১৮ জন, পাকিস্তানের পাঁচজন। নাইজেরিয়ান ছয়জন, চীনের ১৫ জন, শ্রীলংকার ছয়জনসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিক রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে কারা অধিদপ্তরের এআইজি (উন্নয়ন ও মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশি বন্দিদের মধ্যে যাদের সাজার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তাদের তালিকা তিন মাস পর পর অধিদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ম অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে। আবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বন্দিদের তালিকা ও ঠিকানা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে তাদের নাগরিককে নিয়ে যেতে বলে। কিন্তু দূতাবাস থেকে আর কোনো উত্তর আসে না। ফলে এসব বন্দিকে ফেরত পাঠানোও সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে জানতে ভারত ও মিয়ানমার দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মেইল করা হয়। কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি সময়েও কোনো উত্তর দেয়নি কোনো দূতাবাসই।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত বন্দির তালিকা ধরে উল্লেখিত ঠিকানায় খোঁজ নেয় দূতাবাসগুলো। কিন্তু উল্লেখিত ঠিকানায় ওই বন্দির পরিবারের কারও সন্ধান পাওয়া যায় না। তখন ওই বন্দি তার দেশের নাগরিক নয় বলে জানিয়ে দেয় এবং তাকে ফেরত নিতে অপারগতা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট দেশ। শুধু এ কারণেই ১৫৭ বিদেশি বন্দি নিজ দেশে ফিরে যেতে পারছেন না।
হিমঘরে পড়ে আছে তিন মরদেহ
একই জটিলতায় হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে আছে তিন ভারতীয় নাগরিকের মরদেহ। ভারত সরকার এদের জীবিত অবস্থায় তো নেয়নি, এখন মৃতদেহও নিতে নারাজ। তারা হলেন ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি শরিয়তপুর থানা পুলিশ কর্তৃক অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া পিন্টু কুমার (৩৪)। গ্রেপ্তারের সময় পিন্টু নিজেকে ভারতীয় নাগরিক বলে পুলিশকে জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া আর কোনো তথ্যই জানাতে পারেননি। সেই অনুযায়ী, পিন্টুর ফাইলে নাগরিকত্ব লেখা রয়েছে ভারত। এক বছর সাজা শেষে কারাগারেই ছিলেন। গত ১৯ মার্চ হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়। বর্তমানে তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের হিমঘরে রয়েছে। ডায়াবেটিসজনিত কারণে গত ৩ মার্চ মারা যান তেলেঙ্গানা রাজ্যের বাসিন্দা লালমহন (৫৫)। তার মরদেহও ঢামেক মর্গে রয়েছে। লালমহনকে ২০২৪ সালের ২৭ এপ্রিল গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। জয়পুরহাট কারাগারে থাকা অবস্থায় গত বছরের ২১ ডিসেম্বর হার্ট অ্যাটাকে মারা যান আরেক ভারতীয় জীবন দে (৫২)। বর্তমানে তার মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রয়েছে। গত বছরের ১ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করে জয়পুরহাট থানা পুলিশ। কারা অধিদপ্তর বলছে, এই তিন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়টি ভারত সরকারকে অবহিত করা হয়েছে। মরদেহ নিয়ে যেতেও বলা হচ্ছে। কিন্তু ভারত সরকার কোনো সাড়া দিচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী, তিন মাস পর্যন্ত মরদেহ হিমঘরে রাখার বিধান রয়েছে। এর মধ্যে না নিলে মরদেহ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন কিংবা সৎকার করা হবে।

No comments