৬৭০ কোটি টাকায় গড়ে তোলা হবে সাইবার নিরাপত্তাবলয়
বাংলাদেশে দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল কার্যক্রমকে সুরক্ষিত রাখতে প্রায় ৬৭০ কোটি টাকার একটি বড় সাইবার নিরাপত্তা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী সাইবার সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘সাইবার ভলান্টিয়ার’ বা স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিয়ে তৃণমূল পর্যায়েও সাইবার সচেতনতা ও নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে।
‘স্ট্রেংদেনিং ক্যাপাসিটি অব ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে জাতীয় সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি (এনসিএসএ)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে সহায়তা নিয়ে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই সমীক্ষার ভিত্তিতেই প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় ও অর্থায়নের কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশে ডিজিটাল সেবা, অনলাইন আর্থিক লেনদেন এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে। এতে সাইবার হামলা, হ্যাকিং, তথ্য চুরি বা আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে থাকবে একটি জাতীয় সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার (এনএসওসি), একটি জাতীয় কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (এনসিইআরটি) এবং বিভিন্ন নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (এনওসি)। দেশের ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান এবং ৬৪টি জেলায় এসব নজরদারি ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হবে।
এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় একটি জাতীয় ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে, যেখানে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করা যাবে। পাশাপাশি একটি সাইবার সিকিউরিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যেখানে দেশীয় জনবলকে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন কোর্সের মাধ্যমেও দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা কর্মী তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘সাইবার সিকিউরিটি চ্যাম্পিয়ন’ বা সাইবার স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেওয়া হবে। তারা স্থানীয় পর্যায়ে মানুষকে অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করবে এবং সাইবার প্রতারণা বা ঝুঁকি মোকাবেলায় সহায়তা করবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সাইবার ড্রিল, গবেষণা কার্যক্রম ও নীতিমালা উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হবে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সাইবার নিরাপত্তা হেল্পলাইন চালু করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে নাগরিকরা দ্রুত সাইবার সমস্যার সহায়তা পেতে পারবে।
প্রাথমিক হিসাবে পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৭০ কোটি টাকা, যা প্রায় ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। তবে বাধ্যতামূলক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় পরিবর্তিত হতে পারে। এই সমীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রায় ৫০ মিলিয়ন টাকা বা প্রায় চার লাখ ডলারের সহায়তা চাওয়া হয়েছে এডিবির কাছে। সমীক্ষা শেষে প্রকল্পে কতটুকু বৈদেশিক সহায়তা এবং কতটুকু সরকারি অর্থায়ন থাকবে, তা নির্ধারণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একটি সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা তৈরি হওয়ায় সাইবার হামলা বা প্রতারণা থেকে আর্থিক ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো আরো সুরক্ষিত হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। উন্নত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে ডিজিটাল বাণিজ্য, অনলাইন লেনদেন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের জন্যও ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের পরিবেশ আরো নিরাপদ হবে। সরকারি সেবা, অনলাইন ব্যাংকিং বা আর্থিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার সময় সাইবারঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত সাইবার স্বেচ্ছাসেবক এবং এআইভিত্তিক হেল্পলাইনের মাধ্যমে মানুষ দ্রুত সহায়তা পাবে। সরকারের জন্যও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে সাইবার হামলার ঘটনায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো সুরক্ষা এবং তথ্যভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন আরো শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

No comments