ইউনূসের জমানায় কেমন ছিল মিডিয়া
অন্তর্বর্তী সরকারের জমানায় কেমন ছিল মিডিয়া? দখল-বেদখল এবং পালাবদল ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। চাকরিচ্যুতি আর মামলায় আটকে ছিল মিডিয়ার স্বাভাবিক গতি। প্রিন্ট এবং টেলিভিশনে একই চিত্র ছিল। মব সন্ত্রাস তো ছিলই। প্রফেসর ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনকালে মিডিয়া তার স্বাভাবিক কাজই করতে পারেনি। ভয়ভীতি আর চাকরিচ্যুতির ঘটনা বারবার মিডিয়ার গতি রোধ করেছিল। সেলফ্ সেন্সরশিপ পরিণত হয়েছিল অতিমারিতে। যার খেসারত এখনো দিতে হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান তো বলেই ফেললেন, মিডিয়ায় সে রকম কম্পন এখন দেখতে পাচ্ছি না। বাস্তব অবস্থা তা-ই। মিডিয়ায় এখনো ভয়ভীতি কাজ করছে। চাকরি হারানোর ভয়ে এখনো অনেকেই তটস্থ। ৫ আগস্টের পর হঠাৎ করেই মিডিয়ার চেহারা বদলে যায়। যাঁরা বিগত সরকারের সময় সাংবাদিক পরিচয় ভুলে গিয়ে দলীয় কোরাস গাইতেন, তাঁরা মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যান। শূন্যস্থান পূরণ করবে কারা! মালিকপক্ষ পেরেশানিতে পড়ে গেলেন।
এখানে বলা ভালো, মালিকদেরও অনেকে দৌড়াতে থাকলেন। শূন্যস্থান পূরণে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। যার পরিণতিতে মিডিয়া হয়ে গেল একদম নিয়ন্ত্রিত। চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটল অনেক। অনেকে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। কেউবা গ্রেপ্তার হলেন ঢালাও হত্যা মামলায়। অনেকেই এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকলেন। মিডিয়াতে এমন পরিস্থিতি আর কখনো দেখা যায়নি। মিডিয়া দখলের কালচার শুরু হয়ে গেল। অনেকেই চাকরি হারানোর ভয়ে শাহবাগমুখী হয়ে গেলেন। ইউনূসের জমানায় কেমন ছিল মিডিয়াশাহবাগ থেকেই মিডিয়া পরিচালিত হতে থাকল। সবকের পর সবক আসতে থাকল। টেলিফোন ছিল সরব। চালু ছিল বিমানবন্দরের ফাঁদ। হুমকি-ধামকি দিয়ে মিডিয়াকে কাবু করা হলো। মিডিয়াও আত্মসমর্পণ করতে থাকল। কথায় কথায় দখল আর চাকরিচ্যুতির ঘটনায় কলঙ্কিত হলো গোটা মিডিয়া। পরিচিতি পেতে থাকল ‘গদি মিডিয়া’ হিসেবে।
অথচ ৫ আগস্টের চেতনা ছিল একটি স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম। এর কোনোটাই পাওয়া গেল না। ক্ষমতার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার খেসারত দিতে হলো মিডিয়াকে। মুক্ত গণমাধ্যমের আড়ালে অনেকে বাণিজ্যও করে ফেললেন এই সুযোগে। আজ না হোক, কাল তদন্ত হলে চমকপ্রদ কিছু তথ্য বেরিয়ে আসবে। মিডিয়ায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। এখানেও ছিল অসুস্থ রাজনীতির খেলা। সাংবাদিকরা সোচ্চার ছিলেন না। প্রতিবাদ হয়েছে খুব সামান্যই। উপদেষ্টারা ছিলেন নীরব। প্রফেসর ইউনূস তো ঘুমিয়েই ছিলেন। তাঁর উপদেষ্টা পরিষদ কোনো ভূমিকাই রাখেনি। বরং তাঁরা আরও উসকে দিয়েছে প্রশাসনের ভিতরে ঘুঁটি চালাচালি করে। পুলিশের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। এ নিয়ে কোনো তদন্ত হয়নি। জানাও যায়নি এর পেছনে কারা ছিল। তবে কাজটি যে ছিল পরিকল্পিত, এটা আখেরে প্রমাণিত হয়েছে। ঢালাও হত্যা মামলাগুলোর কোনো সুরাহা হয়নি। অনেকেই অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সে সুযোগ তাঁরা পাচ্ছেন না। গণতান্ত্রিক সরকার আসার পরও এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, তাঁর সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। মিডিয়ায় আগেও রাজনীতি ছিল। কিন্তু ফ্যাসিবাদী শাসনকালে মিডিয়া ছিল এককেন্দ্রিক, খবরদারির। যে কারণে এই গদি মিডিয়া কালোকে কালো বলতে পারেনি। সাদাকে সব সময় লাল বলেছে। এমনিতেই বিশ্বব্যাপী মিডিয়া অস্তিত্ব সংকটে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যাতা শিকেয় তুলেছে। অপতথ্য হয়ে গেছে খাঁটি তথ্য। মানুষ বুঝতেই পারছে না কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক। এআই এসে সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। এখানে মানুষ বড় অসহায়। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে মানুষ ভিকটিম হচ্ছে। এখনো বাংলাদেশ ‘অনুগত সাংবাদিকতা’র মিছিল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এটা যেন এক মহামারি রূপ নিয়েছে।

No comments