শিরোনাম

৪০ দিনের যুদ্ধই মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি বানিয়েছে ইরানকে

চ্যানেল টেন ডেস্কঃ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের দীর্ঘ ৪০ দিন পর অবশেষে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ। তবে এই সমঝোতায় ইরান কোনোভাবেই মাথা নত করেনি। বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে দুর্বল ভেবেছিলেন— সেই হিসাব এখন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। শেষ পর্যন্ত ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে সম্মত হয়েই পিছু হটতে হয়েছে তাকে।

এক সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের নিজেদের সরকার দখলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখন একই ব্যক্তি ইরানকে ‘পাথর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিচ্ছেন— এই অবস্থান পরিবর্তনই পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরে।

হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হাজার হাজার মেরিন সেনা পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। উদ্দেশ্য ছিল জোর করে প্রণালি খুলে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—মার্কিন নৌবহর এখন নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে, আর ইরানই নির্ধারণ করছে কোন জাহাজ চলবে। এমনকি প্রতিটি জাহাজকে প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত চীনা ইউয়ানে টোল দিতে হচ্ছে।

এক মাস আগে ইসরায়েলি সেনাপ্রধান এয়াল জামির দাবি করেছিলেন, ইরানের ৮০ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু এখন নিয়মিত মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১৩ হাজারের বেশি বিমান হামলার পরও ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ইরাক, সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো ইরান ভেঙে পড়েনি। সেখানে নেতা অপসারণ বা মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধসে পড়েছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন—মোসাদ ও সিআইএর অনুপ্রবেশ এবং ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের পরও তাদের কমান্ড কাঠামো অটুট রয়েছে। মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নেয়া যে ইরানকে ‘সহজ লক্ষ্য’ মনে করেছিলেন, তা এখন সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত।

দেশটির অভ্যন্তরেও দ্বন্দ্ব রয়েছে— একদিকে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের স্মৃতি, অন্যদিকে ট্রাম্পের হামলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ। তবে বাহ্যিক শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই এখন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ইরানি যোদ্ধাদের ভূমিকা জনমনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করছে।

এই যুদ্ধের প্রভাব গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। সিরিয়ার দামেস্ক, আলেপ্পো, হোমস ও ইদলিবে বিক্ষোভ হয়েছে। আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারো শিক্ষার্থী সিরীয় ও ফিলিস্তিনি পতাকা নিয়ে প্রতিবাদে অংশ নেয়। জর্ডানেও ক্ষোভ বাড়ছে, বিশেষ করে আল-আকসা মসজিদ বন্ধের পর উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। এক জর্ডানিয় সাংবাদিক আলী ইউনেস সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, জনগণের বড় অংশ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ইরানকে সমর্থন করলেও ভয়ের কারণে তা প্রকাশ করতে পারছে না।

মিশরীয় বিশ্লেষক মামুন ফান্দি বলেছেন, ইসরায়েল আবার আরব বিশ্বের শত্রুতে পরিণত হয়েছে—এমনকি যেসব দেশ শান্তিচুক্তি করেছিল, তারাও এখন ভিন্ন অবস্থানে। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে শান্তির ধারণাকে তিনি ‘ভ্রম’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। ইউরোপে ডিজেলের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রাম্পের এই সামরিক পদক্ষেপ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও কার্যকর একটি শক্তি দিয়েছে—বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা।

এ দিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন উদ্যোগও ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি ও প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তা কার্যকর হয়নি। ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করার প্রস্তাব দিলে দেশে তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলা হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তি সাইদ হাদাদিয়ান তাকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প মনে করছেন ইরান হরমুজকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে এটি ভুল হতে পারে—ইরান সম্ভবত এটিকে যুদ্ধ-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবেই দেখছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান আক্রমণ থেকে বিরত রাখতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তাদের তেল ও গ্যাস খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার শিকার হয়েছে হোটেল ও বিমানবন্দরও। বিপুল বিনিয়োগের পরও তারা প্রত্যাশিত সুবিধা পায়নি।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই যুদ্ধ শেষে ইরান আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। ট্রাম্প ‘বিজয়’ ঘোষণা করলেও ইরান হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না। আর মিশরীয় নোবেলজয়ী মোহাম্মদ এলবারাদেইর মতে, আরব বসন্ত নিঃশেষ হয়নি—বরং তা এখনো সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে, যেখানে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও দুর্নীতির বাস্তবতা আগের চেয়েও স্পষ্ট।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের ইরান আক্রমণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিয়েছে—আরব ও ইরানি, ধনী ও দরিদ্র, সুন্নি ও শিয়া—সবাইকে এক কাতারে এনে দিয়েছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

No comments