অন্তর্বর্তী সরকারে বিদায়ের সুর
নির্বাচন সমাগত। তারপরই আসবে নির্বাচিত নতুন সরকার। ফলে গত প্রায় দেড় বছর রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা অন্তর্বর্তী সরকারে এখন বাজছে বিদায়ের সুর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল এ সরকার। আর মাত্র দুদিন পরই অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে আসবে নতুন সরকার। তার আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে সরকারি বাসভবন ছেড়েছেন একাধিক উপদেষ্টা।
পাশাপাশি সচিবালয়সহ দপ্তরগুলোতে ফাইলপত্র গুছিয়ে রাখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, নতুন সরকার আসলে যাতে দায়িত্ব হস্তান্তর সহজ হয় এবং সহজে সরকারের সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়া যায়, এজন্য সব প্রস্তুত করে রাখা হচ্ছে। এমনকি নতুন সরকার আসলে কোনোরকম কালক্ষেপণ না করেই দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। নির্বাচনের পর যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
এদিকে, গতকাল রবিবার সচিবালয়ে বেশ কয়েকটি দপ্তর ঘুরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ঢিলেঢালা ভাব দেখা গেছে। কর্মচারীরা উপদেষ্টাদের বিদায় দেওয়ার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছগাছ করছেন। কর্মকর্তারা নানা প্রকল্পের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে জানান, গত সপ্তাহেই উপদেষ্টা মহোদয় সবার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরাও স্যারের সব রেডি করে দিচ্ছি। অন্য মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা এবং তাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তারাও একই ধরনের কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অন্যরকম ব্যস্ততা। নতুন মন্ত্রীদের জন্য বাসা ও অফিস ঠিকঠাক করার কাজ করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। সরকারি আবাসন পরিদপ্তরও সমন্বয় করে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এলে তাদের থাকার বিষয়ে আমাদের সব প্রস্তুতি নেওয়া আছে। সব প্রকিউরমেন্ট প্রসেস রেডি আছে। নতুন সরকার আসতে আসতে বাকি কাজগুলোও যথাসময়ে শেষ হয়ে যাবে। প্রকৌশলীরা সেভাবেই কাজ করছেন।
সরকারি আবাসন পরিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। আরও কয়েকজন বাসা ছাড়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আবেদন করেছেন। বেইলি রোডের মিনিস্টার অ্যাপার্টমেন্টের ৩ নম্বর ভবনের বাসাটি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরীর নামে বরাদ্দ ছিল। তিনি বাসাটি ছেড়ে দিয়েছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, বাসাটি বরাদ্দ হওয়ার পর বেশি দিন থাকেননি তিনি।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান গত ৩১ জানুয়ারি সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি গুলশানের অ্যাভিনিউ সড়কের সিইএস (এ)-৫১, হোল্ডিং নম্বর ৯২-এ সরকারি বাসায় থাকতেন। এর আগে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া হেয়ার রোডের ৬ নম্বর সরকারি বাসভবন ছেড়ে দেন।
তাছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, রেল, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, পরিবেশ ও তথ্য উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানও বাসা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
উপদেষ্টাদের একান্ত সহকারী সচিবদের মধ্যে আবিদ সরকার সোহাগের নামে সরকারি বাসা বরাদ্দ ছিল। এ ছাড়া অন্য উপদেষ্টাদের এপিএসদের নামে সরকারি বাসা বরাদ্দের তথ্য আবাসন পরিদপ্তরে নেই।
পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, উপদেষ্টা অথবা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ক্ষেত্রে বাসা ছাড়ার বিষয়ে আইনে পরিষ্কারভাবে কিছু বলা নেই। তবে বাসা বরাদ্দসংক্রান্ত আইনে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা চাকরির মেয়াদ শেষে বাসা ছাড়তে দুই মাস সময় পান। উপদেষ্টা ও মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ম অনুসরণ করা হয়ে থাকে। সে হিসেবে উপদেষ্টারা বাসা ছাড়ার জন্য এখনো অনেক সময় পাবেন।
জানতে চাইলে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েকজন উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সরকারি বাসভবন ছাড়ার আবেদন করেছেন। আমরা তাদের আবেদন অনুযায়ী গণপূর্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। তিনি বলেন, বাসা বরাদ্দ দেয় আবাসন পরিদপ্তর। এজন্য বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়ার সবকিছু আবাসন পরিদপ্তর অবহিত থাকে। তবে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি উপদেষ্টারা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যায়ে বুঝিয়ে দেন।
No comments