পুলিশে আবার শুরু রাজনৈতিক তদবির!
চ্যানেল টেন ডেস্ক ঃ
নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর আগামীকাল মঙ্গলবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তবে নতুন সরকার আসতে না আসতেই পুলিশে শুরু হয়ে গেছে ‘রাজনৈতিক তদবির’। ভালো ও লোভনীয় পোস্টিং পেতে এরই মধ্যে নানা মহলে তদবির করছেন পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা। আবার গত দেড় বছর অতি উৎসাহী হয়ে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা একটু বাড়াবাড়ি করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশের বাইরে চলে যাওয়ারও পাঁয়তারা করছেন বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশের ওই সূত্রটি দেশ রূপান্তরকে জানায়, পুলিশপ্রধান (আইজিপি) ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, র্যাব মহাপরিচালকসহ পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোর প্রধান হতে জোর লবিং শুরু হয়েছে। যারা এসব পদে বসতে চাচ্ছেন তারা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ করে চলেছেন। এমনকি বিগত সময়ে যেসব কর্মকর্তা অবসরে চলে গেছেন, তারাও আবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতেও জোরালো তদবির করছেন। সরকার গঠন এবং পরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী নিয়োগ হওয়ার পর এ তদবির আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
এদিকে বর্তমান পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গতকাল পদত্যাগ করেছেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে পুলিশে। তবে দেশ রূপান্তর নিশ্চিত হয়েছে, গতকাল দুপুরের দিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করলেও, তা গ্রহণ করা হয়নি। মন্ত্রণালয় থেকে তাকে বলা হয়েছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আলোচনা করে পদত্যাগপত্র গৃহীত হবে। বর্তমানে তিনি চুক্তিভিক্তিক নিয়োগে আছেন।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই পুলিশে ব্যাপক রদবদল করে। তৎকালীন পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ পুলিশের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হন। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দমনপীড়ন চালায়। গুলিতে শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকজন, পুলিশ, আনসারসহ প্রায় আটশর বেশি প্রাণ হারায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা এই প্রথম। এই নিয়ে দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বইছে এখনো। সাবেক আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যায়ের ১৮৪ কর্মকর্তা ও সদস্যের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে। আবার পুলিশের শীর্ষ কর্তারাও চলে গেছেন ‘আত্মগোপনে’। পরে আইজিপিসহ পুলিশের সবকটি ইউনিটিতে শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। কয়েক মাস পর আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনারের নিয়োগ বাতিল করে বাহারুল আলমকে আইজিপি ও শেখ মো. সাজ্জাত আলীকে ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে সর্বাধিক আসন পেয়েছে বিএনপি। দলটি আগামীকাল সরকার গঠন করবে। ইতিমধ্যে দলটির অনুকম্পা পেতে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলছেন।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের ভেতর দলবাজির বিষয়টি একদিনে গড়ে ওঠেনি। এটি সব সরকারের আমলেই ছিল। আওয়ামী লীগ আমলে এক পুলিশের ভেতরই ১০ থেকে ১২টি গ্রুপ ছিল। ওইসব গ্রুপের নেতারা কারও নির্দেশই মানতেন না। বর্তমানে যারা দলবাজি করছেন, তারাও একসময় চরম অবহেলিত ছিলেন। তাদের দিনের পর দিন প্রমোশন ও পোস্টিং দেওয়া হয়নি। নতুন সরকার পুলিশকে জনগণের আস্থার জায়গায় যদি ফেরাতে চান, তাহলে সংস্কার করে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে। এভাবেই হয়তো একটা সময় প্রকৃত পুলিশিং ফিরে আসবে। যারা যোগ্য তারাই যেন ভালো থাকেন, সেই ব্যবস্থা করলেই ভালো।
নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বড় বড় পদ পেতে পুলিশ কর্মকর্তারা বিএনপি নেতাদের কাছে তদবির করছেন। একেকজন ‘একেক বলয়ে’ দোহাই দিয়ে কাজ হাসিল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিশেষ করে আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার, র্যাব মহাপরিচালক, হাইওয়ে, এসবি, সিআইডি, পিবিআই, এপিবিএনসহ পুলিশের সবকটি ইউনিটপ্রধান হতে বিএনপির একাধিক মহলে চেষ্টা করছেন। এমনকি ১৬-১৭ বছর আগে যেসব কর্মকর্তা ‘অবসরে’ গেছেন, তারাও পুলিশের শীর্ষ পদে আসার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। আসলে পুলিশ কখনো রাজনৈতিক বেড়াজাল থেকে বের হতে পারবে না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু কর্মকর্তা ভালো স্থানে থেকেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। কেউ কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের তোষামোদি করেছেন। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর কয়েকজন দেশের বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। বিষয়টি সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ সংস্কার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কবে হবে, তা বলতে পারছি না।
পুলিশ সূত্র জানায়, দেশের বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি করতে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই গভীর মনোযোগ দেবে। আর এ কারণে পুলিশে বড় ধরনের রদবদল করার চিন্তাভাবনা চলছে। মঙ্গলবার মন্ত্রীদের শপথ নেওয়ার পরপরই নিশ্চিত হবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কে পাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি পুলিশকে ঢেলে সাজাবেন। সেই আলোকে পুলিশ কর্তারা তদবির শুরু করে দিয়েছেন। পুলিশে ভালো পদে পোস্টিং পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন একশ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তা। এজন্য তারা নিয়মিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। এমনকি রাজনৈতিক মতাদর্শের সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের দপ্তরেও নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন। পুলিশে বড় রদবদলের পর আবারও বদলির কানাঘুষা শুরুর পর এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে পুলিশের ইউনিটগুলোতে। এমনকি ভালো পদ পেতে টাকা লেনদেনের অভিযোগও উঠছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে। পুলিশ সদর দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পোস্টিং পেতে অনেকের জোর লবিং চলছে। রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার এসপি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও থানার ওসি পদে নিয়োগ পেতে বিভিন্ন স্থানে তদবির চালাচ্ছেন অনেকে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি পুলিশ কমিশন গঠন করে কমিশনের অধীনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারাও চাচ্ছেন পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি কমিশনের অধীনেই হোক। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিগত সরকারের ছত্রছায়ায় একশ্রেণির দলবাজ, লাইনবাজ, ঘুষখোর পুলিশ কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগ বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য হয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আর ব্যবহৃত চাচ্ছেন না তারা।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন ডিআইজি পদমর্যাদার একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বদলি ও পদোন্নতি সমানভাবে করতে হবে। রাজনৈতিক নেতা ও দল পুলিশকে ব্যবহার করতে পারবে না। ১৮৬১ সালের ৫ নম্বর আইনে পুলিশ পরিচলিত হচ্ছে। তাছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮ সালের ৫ নম্বর আইন), সাক্ষ্য আইন (১৮৭২ সালের ১ নম্বর আইন), পুলিশ প্রবিধানমালা বেঙ্গলসহ (১৯৪৩) অন্যান্য আইনে কার্য সম্পাদন করে থাকে পুলিশ। সবকটি আইনই ব্রিটিশ আমলের তৈরি করা। এসব আইন পরিবর্তন করা জরুরি হলেও করা হচ্ছে না।
No comments