শেষ হচ্ছে প্রচার উৎসব, ভোটের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে দেশ
১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এখন চরম নির্বাচনী উৎসব চরমে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটায় শেষ হচ্ছে দীর্ঘ তিন সপ্তাহ ধরে চলা প্রচার-প্রচারণার উৎসব। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিধান অনুযায়ী, ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের সভা-সমাবেশ ও মাইকিং বন্ধ হয়ে যাবে। মটরসাইকেল চলাচলেও নেমে আসবে বিধি-নিষেধ।
ভোট সামনে রেখে রাজধানীর নির্বাচন ভবন থেকে দেশজুড়ে নির্বাচনী সরঞ্জাম বিতরণের কাজ চলছে। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এসব সারঞ্জাম প্রথমে যাচ্ছে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে, এরপর সেখান থেকে থেকে প্রতিটি উপজেলায় এসব ব্যালট পেপার ও প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভোট কেন্দ্রগুলোর তৈরির চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। বিভিন্ন স্থানে চলছে নিরাপত্তা মহড়াও।
বিগত সপ্তাহগুলোতে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক গ্রাম পর্যন্ত প্রার্থীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল। বড় দলগুলোর প্রার্থীরা মূলত রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এবার প্রার্থীদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদেরও উঠান বৈঠক প্রচারে সক্রিয় দেখা গেছে। শেষ মুহূর্তে ভোটারের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। দিন-রাতকে হারাম করে প্রার্থীদের কর্মিরাও ছুঁটছেন এলাকার বিভিন্ন প্রাপ্ত।
প্রচারের শেষ দিকে এসে নির্বাচন কমিশনের একটি নির্দেশনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ভোট কেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে ভোটারদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ করায় জনমনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একে ‘তথ্য অধিকার হরণ’ ও ‘ভোট চুরির পরিকল্পনা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবিতে ইসি ঘেরাওয়ের আল্টিমেটাম দিয়েছে।
গত ২২ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই দীর্ঘ প্রচারযুদ্ধ এখন চূড়ান্ত লগ্নে এসে পৌঁছেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে।
এবার মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে মোট ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ থাকছে ভোটারদের জন্য। আর, এবারের নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের মোট ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন।
এবারের নির্বাচনে সর্বোচ্চ প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি (ধানের শীষ, ২৯১ জন)। এর পরেই রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (হাতপাখা, ২৫৮ জন), জামায়াতে ইসলামী (দাঁড়িপাল্লা, ২২৯ জন), জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল, ১৯৮ জন) এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি (শাপলা কলি,৩২ জন)। আর, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ফুটবল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন ৭৬ জন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের চূড়ান্ত ফলাফল শুক্রবার ১৩ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ ভোটগ্রহণের পরদিন বিকেলের মধ্যেই ঘোষণা করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি জানান, দুর্গম কিছু এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে ফলাফল পেতে সামান্য বিলম্ব হতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই তিন দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনী পরিবেশ অনেক বেশি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রচারের শেষ মুহূর্তে ভোটারের মন জয় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রার্থীরা, সেসঙ্গে দিচ্ছেন আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি। পাশাপাশি তাদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরাও উঠান বৈঠক ও নারী সমাবেশে অংশ নিয়ে সরব উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। তবে ভোটাররা জান্চ্ছেন, তাঁরা গতানুগতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিয়ে দক্ষ প্রতিনিধি নির্বাচন করতে চান। তাদের মূল চাওয়া, নিরাপদ জীবন ও নিত্যপণ্যের সুলভ মূল্য।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড এবং নৌ-বাহিনীসহ প্রায় ৯ লাখ সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকবেন। প্রায় আট লাখ কর্মকর্তা ভোট গ্রহণের দায়িত্ব পালন করবেন। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণের জন্য স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপারসহ সব সরঞ্জাম পাঠানোর কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
ভোটারদের প্রত্যাশা দীর্ঘদিন পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকা সাধারণ ভোটাররা ‘সুষ্ঠু পরিবেশ’ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত থাকলেও ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী। জনগণের প্রত্যাশা, এবার শুধু কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ভোটের মাধ্যমে এমন প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে যারা প্রকৃত অর্থেই জবাবদিহিমূলক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবেন।

No comments