ভোটে সহিংসতা-গণপিটুনিতে মৃত্যু বেড়ে দ্বিগুণ
চ্যানেল টেন ডেস্কঃ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১১দিন। নির্বাচন ঘিরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। দেশে গত জানুয়ারি মাসে নির্বাচনী সহিংসতা ঘটেছে ৬৪টি। এতে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে ৫০৯ জন। একইভাবে নির্বাচনকে ঘিরে গণপিটুনিতে গত এক মাসে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বেড়েছে অজ্ঞাত লাশ ও কারা হেফাজতের মৃত্যুর সংখ্যাও। দেশের সীমান্তে জানুয়ারি মাসে গুলিবিদ্ধ হয়েছে ৬ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। গতকাল শনিবার মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর মাসের তুলনায় নির্বাচনী সহিংসতা, গণপিটুনি, কারা হেফাজতের মৃত্যু, অজ্ঞাত লাশ দ্বিগুণ ও সীমান্তে গুলিবিদ্ধের সংখ্যা তিনগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিস্থিতি সব দিক থেকে অবনতির কথা উল্লেখ করে এমএসএফের প্রধান নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে রয়েছে, কিন্তু তাদের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। তফসিল ঘোষণার পর সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশন প্রধান হলেও মনে হচ্ছে কমিশন উপদেষ্টা পরিষদের দায়িত্ব পালন করছে। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে দায়িত্ব পালন করছে তা মোটেও কাক্সিক্ষত নয়। নির্বাচনে জামায়াত বিএনপিকে যেভাবে উসকানি দিচ্ছে সেই অনুসারে দেশের পরিস্থিতি অনেক শান্ত রয়েছে। তারপরও গত ডিসেম্বর মাসের চেয়ে জানুয়ারি মাসে নির্বাচনী সহিংসতায় মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের, আহত হয়েছে ৫০৯ জন। একইভাবে গণপিটুনি, কারা হেফাজতের মৃত্যু, অজ্ঞাত লাশ ও সীমান্তে গুলিবিদ্ধর সংখ্যাও বেড়েছে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ।
এমএসএফ-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের মধ্যে জানুয়ারি মাসে মোট ৬৪টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব সহিংসতায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে ৫০৯ জন। আর ডিসেম্বর মাসে সারা দেশে সাতটি সহিংসতায় একজনের প্রাণহানির পাশাপাশি ২৭ জন আহত হয়েছিলেন। এর বাইরে চলতি মাসে ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ২১৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুষ্কৃতিকারীর হামলায় মারা গেছে ৬ জন। ডিসেম্বরে ১৬টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১২৪ জন আহত হয়েছিলেন। ওই মাসে দৃষ্কৃৃতিকারীর হামলায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৪ জনে। তুলনামূলক বিশ্লেষণে এমএসএফ বলছে, এটি প্রমাণ করে যে, জানুয়ারি মাসে নির্বাচনী প্রক্রিয়া কার্যত প্রাণঘাতী সহিংসতার দিকে যাচ্ছে।
এদিকে মব সন্ত্রাসে মানুষ হত্যার ঘটনা এ সরকারের আমলে বেড়েছে উল্লেখ করে এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মব বা গণপিটুনির ২৮টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১ জন। গত ডিসেম্বরে এ ধরনের ২৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১০ জন। এমএসএফ বলেছে, গণপিটুনির ঘটনায় জানুয়ারিতে নিহত ও আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। এই মানবাধিকার সংগঠনটি মনে করে, আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ, যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড হিসেবেই গণ্য করা হয়ে থাকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি জানুয়ারি মাসে ৫৭টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে। ডিসেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ৪৮। এমএসএফ বলেছে, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া সমাজে সহিংসতা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কা জোরদার করে। এ ছাড়া গত ডিসেম্বরে কারা হেফাজতে ৯ জন মারা গেলেও এ মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে হেয়েছে ১৫।
নির্বাচনী সহিংসতায় মৃত্যু : প্রতিবেদন অনুযায়ী, ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার এরশাদ বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ-২ আসনের কটিয়াদি উপজেলার আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. কামাল উদ্দিন ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চনে আজাহর নামে এক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত হয়েছেন।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী সহিংসতার ৬৪টি ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৩টি ঘটনা বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের। এ ছাড়া বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে ১৩টি, বিএনপি-স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের ৯টি সংঘর্ষ, গণ অধিকার পরিষদ-স্বতন্ত্রের একটি এবং বিএনপি-এনসিপির মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে।
বেড়েছে মামলায় আসামির সংখ্যা : এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে অর্ধেকে নেমে এলেও (১৬ থেকে ৮), সরকার পতনের পর সংঘটিত হত্যাকা- ও সহিংসতার ঘটনায় শেখ হাসিনাসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোয় আসামির সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে, জানুয়ারিতে নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ১২০ এবং অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ১১০ থেকে বেড়ে ৩২০ হয়েছে। এমএসএফ বলছে, এ অবস্থা আইনগত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণমামলার প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
সংখ্যালঘু নির্যাতন : জানুয়ারি মাসে বেড়েছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাও। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে প্রতিমা ভাঙচুর, বাড়িঘর ভাঙচুর, মামলাসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি। অথচ ডিসেম্বরে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল ৪টি। এমএসএফ বলছে, প্রতিমা ভাঙচুর, অগ্নিকান্ড ও সংখ্যালঘুদেও ওপর হামলার ঘটনা জানুয়ারি মাসে স্পষ্টভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পুনরুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।
কারা হেফাজতে মৃত্যু : চলতি জানুয়ারি মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে দুটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া এসব বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে একজন নিহত হয়েছেন। এমএসএফ বলেছে, নির্যাতনে মৃত্যুর সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় স্পষ্ট হয় যে হেফাজতে নির্যাতন এখনো একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান।

No comments