শিরোনাম

নির্বাচনের আগে টার্গেট কিলিংয়ের শঙ্কা

 

চ্যানেল টেন ডেস্কঃ

দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করতে ‘টার্গেট কিলিং’য়ের আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। তারা জানিয়েছে, এমন শঙ্কা থেকেই নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলীয়প্রধান থেকে শুরু করে প্রায় প্রত্যেক প্রার্থীর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। দেশজুড়ে ছড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা জাল। সীমান্তেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অবৈধ পারাপার ঠেকাতে তালিকা করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে লাইনম্যানদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বডি ওর্ন ক্যামেরাগুলো ভোটের দিন চালুর কথা থাকলেও সতর্কতা হিসেবে আগেই সেগুলো ‘ফাংশনাল’ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরা এসব ক্যামেরা নিয়েই তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যেগুলো পুলিশ সদর দপ্তর এবং ডিএমপি কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিক মনিটর করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মনিটর করা হচ্ছে মেট্রোপলিটন এলাকা এবং জেলা শহরের সিসি ক্যামেরাগুলো।

টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কা থেকে অস্ত্রের মুভমেন্ট যেন না ঘটে, সেজন্যও বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে বাহিনীগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তল্লাশি চৌকি বসানোর পাশাপাশি, মোবাইল প্যাট্রল, গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চলছে। যৌথ বাহিনীর অস্ত্র উদ্ধার অভিযান এরই মধ্যে জোরদার করা হয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, সুনির্দিষ্টভাবে কেউ টার্গেটে রয়েছেন—এমন তথ্য পাওয়া না গেলেও হেভিওয়েট প্রার্থীদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেজন্য বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ দলীয় প্রধানদের একই ধরনের ভিআইপি নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। বাসভবন থেকে শুরু করে মুভমেন্ট ও সভাস্থলে নিরাপত্তা পাচ্ছেন তারা। এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার মতো প্রার্থীদেরও বিশেষ নিরাপত্তা চাদরে রাখা হচ্ছে।

প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ২০ জনকে এই বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারকে সে অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর সূত্রে জানা গেছে, গুরুত্ব বিবেচনায় কারও বাড়িতে রাখা হয়েছে পুলিশি পাহারা। আর যাদের ঝুঁকি বেশি তাদের গ্যানম্যান, পুলিশ প্রটোকল এবং বাসার নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নির্বাচনের আগে পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হতে পারে। বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনমনে ভোট নিয়ে ভীতি তৈরি করার চেষ্টা করা হতে পারে। একই প্রতিবেদনে ‘টার্গেট কিলিং’ নিয়ে শঙ্কার কথাও এসেছে।

পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা একটা বিষয় নিয়ে শঙ্কিত, সেটা হলো টার্গেট কিলিং। এটার ব্যাপারে প্রচণ্ড সতর্ক আমরা। হামলা আওয়ামী লীগ ব্যাকড হতে পারে। এর পাশাপাশি কোনো রাজনৈতিক শক্তিও টার্গেট কিলিং সংঘটিত করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে পারে। তাদের ব্যাপারেও আমরা সতর্ক আছি।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা পালিয়ে দেশের বাইরে চলে গেলেও তাদের নেতাকর্মীদের বড় অংশ দেশে আছে। এরই মধ্যে দুই দফায় চলা ডেভিল হান্টে গ্রেপ্তারও হয়েছে অনেক। তবে তারা থেমে নেই। প্রতিনিয়তই গোপন বৈঠক করছে। নাশকতার পরিকল্পনা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য হুমকিও দিচ্ছে তারা। নির্বাচন ঠেকানোর নামে অপতৎপরতা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। দেশে যারা আছে, তারা যেন কোনো ধরনের অপকর্ম করতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচনের মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের স্পেশাল ব্রাঞ্চ, এনএসআই, ডিজিএফআই জালের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। পোশাকে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অলরেডি ফিল্ডে আছে। এ ছাড়া প্রত্যেক জেলায় এবং ঢাকার পেশাদার অপরাধীদের, শুটারদের তালিকা করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, নজরদারি করা হচ্ছে।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার পর অপরাধীরা সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যায়। তাদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছে লাইনম্যানরা। এরপর থেকেই লাইনম্যানদের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয় পুলিশ। কেউ অপরাধ করে যেন পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য সীমান্তে অবৈধ পারাপারের সঙ্গে যুক্ত এমন ৭৮৭ লাইনম্যানের নাম তালিকাভুক্ত করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সীমান্তের ২৭ জেলায় বিশেষ নজরদারির জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিহ্নিত লাইনম্যানদের গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হয়েছে বলেও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা আশা করছি, কোনো ঘটনা ঘটবে না। যদি কেউ ঘটায়ও, পার পাবে না। বের হয়ে যেতে পারবে না। সীমান্তে যারা পারাপারের কাজ করে, তাদের মধ্যে যাদের পাচ্ছি, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বাকি সব পালিয়ে আছে। তাদের ফাংশন করার সুযোগ নেই।

বডিঅর্ন ক্যামেরাগুলো চালু করা এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তা নিয়মিত মনিটরিংয়ের বিষয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশে বডিঅর্ন ক্যামেরা নিয়ে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা নির্দেশ দিয়েছি। যেটা হেডকোয়ার্টার থেকে মনিটর করা হচ্ছে। আমাদের সদস্যরা যেখানে আছেন, সে জায়গা লাইভে দেখা যাচ্ছে। ২৫ হাজার রানিং আছে। এর মধ্যে কিছু শুধু ভিডিও রেকর্ড করছে। বাকিগুলো লাইভ।

পুলিশ এখন অনেক কনফিডেন্ট উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা ফুল প্রিপেয়ার্ড, ফুল কনফিডেন্ট। টার্গেট কিলিং নিয়ে বেশি সতর্ক। পুলিশসহ সবাই অত্যন্ত সজাগ। সারা দেশে জালের মতো ছড়িয়ে আছে গোয়েন্দারা। সিসি ক্যামেরা, বডিঅর্ন ক্যামেরা সব অপারেশনাল, যা ইলেকশনের পরও কিছুদিন থাকবে। যদি কেউ নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করে বা কাউকে মারে, পার পাবে না।

টার্গেট কিলিংয়ের শঙ্কা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন কালবেলাকে বলেন, নানা ধরনের হুমকির বিষয়টি মাথায় রেখেই আসন্ন নির্বাচনের নিরাপত্তা প্রটোকল সাজানো হয়েছে। আমাদের প্রত্যেক সদস্যকে সে ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তল্লাশিসহ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চলমান আছে। নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা কেউ যেন চালাতে না পারে, সে ব্যাপারে পুলিশসহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কাজ করছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে যা যা করণীয় আমরা তা করছি।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গতকাল সন্ধ্যায় কালবেলাকে বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমরা ফুল কনফিডেন্ট। কোনো ধরনের সহিংসতা, নাশকতা করে নির্বাচন ঠেকানো যাবে না। আমরা নিজেদের শতভাগ দিয়ে কাজ করছি। প্রার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।

No comments