শিরোনাম

বগুড়ায় ভালো সড়কে তিন কোটি টাকার সংস্কার

 

বগুড়ায় ভালো সড়কে তিন কোটি টাকার সংস্কার

চ্যানেল টেন ডেস্কঃ

সড়কটি ভাঙা ছিল না। বড় কোনো গর্তও ছিল না। তবু রাতের আঁধারে তড়িঘড়ি করে এখানে নামানো হয় কার্পেটিং যন্ত্র। সকালে উঠে দেখা গেল, তিনমাথা রেলগেট থেকে সাতমাথা পর্যন্ত বগুড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অনেক স্থানেই পাথর ছড়িয়ে আছে। প্রায় তিন কোটি টাকার এই কাজ আদৌ জরুরি ছিল কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গতকাল রোববার সরেজমিন দেখা গেছে, এক সপ্তাহ ধরে ২ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের বিভিন্ন অংশে পাথর উঠে ছড়িয়ে পড়েছে। বাইক ও অটোরিকশাচালকের অনেকেই বাধ্য হয়ে গতি কমাচ্ছেন।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নোটিশ বোর্ড অনুযায়ী, এটি পিরিয়ডিক মেইনটেন্যান্স প্রোগ্রামের (পিএমপি) আওতায় নেওয়া প্রকল্প। বগুড়া স্টেশন রোড ডাবল বিটুমিনাস সারফেস ট্রিটমেন্ট (ডিবিএসটি) পদ্ধতিতে সারফেসিং কাজের জন্য চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে তিন কোটি ১১ লাখ ১৩ হাজার টাকা। কাজ শুরু হয়েছে গত ৮ এপ্রিল এবং শেষ করার কথা ছিল ৪ অক্টোবর। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ আছে মুহাম্মদ আমিনুল হক (প্রা.) লিমিটেড। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগের বগুড়া সড়ক বিভাগ।

ডিবিএসটি কাজের মানদণ্ড অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পাথর উঠে যাওয়ার কথা। কিন্তু সরেজমিন দেখা গেছে, বিভিন্ন অংশে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পাথর উঠে গেছে। ফলে কোটিং কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একাধিক কারিগরি অনিয়ম।

এ পদ্ধতিতে প্রথমে হাফ ইঞ্চি ওভার সাইজ পাথর এবং পরের স্তরে হাফ ইঞ্চি ডাউন সাইজ পাথর ব্যবহারের নিয়ম। কিন্তু এই প্রকল্পে সেই নিয়ম মানা হয়নি। অনেক জায়গায় একই সাইজের পাথর ব্যবহার করা হয়েছে, কোথাও আবার এলোমেলোভাবে ছিটানো হয়েছে। ফলে সহজেই উঠে যাচ্ছে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, নির্ধারিত ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার না করে নিম্নমানের ৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার করা হয়েছে।

একজন অভিজ্ঞ সড়ক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ নাক রার শর্তে বলেন, ৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিনতু লনামূলক নরম। এতে পাথরের সঙ্গে বন্ডিং দুর্বল হয়। এই গ্রেড ব্যবহার করলে পাথর উঠে যাওয়ার হার স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।

তিনমাথা এলাকার দোকানি আব্দুল কাদের বলেন, রাতে এসে তড়িঘড়ি কাজ করে চলে যেত। সকালে দেখি রাস্তা চকচকে, কিন্তু প্রথম দিন থেকেই। পাথর উঠে যাচ্ছে।

এদিকে পাথর উঠে যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এবং বিতর্ক শুরু হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রোববার থেকে কিছু অংশে ডাবল লেয়ার দেওয়া শুরু করেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল ফজল অভিযোগ করে বলেন, এটি কোনো পরিকল্পিত মানোন্নয়ন নয়, বরং দায় এড়ানোর কৌশল। প্রথম স্তরের ব্যর্থতা আড়াল করতেই অতিরিক্ত লেয়ার দেওয়া হচ্ছে।

সাতমাথা ষ্টেশন রোডের পুরান বগুড়া এলাকায় গতকাল রোববার ভালো সড়কের ওপরেই ডাবল লেয়ারের জন্য বিটুমিন ঢালতে দেখা যায় ঠিকাদারের নিয়োগ করা শ্রমিকদের

সেউজগাড়ী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মতলুবুর রহমান বলেন, ভুল ধরা পড়ার পর হঠাৎ করে আবার নতুন লেয়ার দিচ্ছে। শুরুতে ঠিকমতো করলে তো এই অবস্থা হতো না।

ভালো সড়কে অপ্রয়োজনীয় কোটিং এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে- যে সড়কটি সংস্কারের জন্য বাছাই করা হয়েছে, সেটি আদৌ ততটা জরুরি ছিল কিনা। রোববার সরেজমিন দেখা গেছে, তিনমাথা রেলগেট থেকে সাতমাথা পর্যন্ত সড়কের বড় একটি অংশ আগেই ভালো অবস্থায় ছিল। বড় ধরনের গর্ত, ভাঙন বা কাঠামোগত ক্ষতি চোখে পড়েনি। তবু এই অংশেই নতুন করে ডিবিএসটি কোটিং দেওয়া হয়েছে।

আজিজুল হক কলেজের সামনে জামিলনগরের বাসিন্দা মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, এই সড়কে বড় কোনো সমস্যা ছিল না। তাহলে হঠাৎ করে রাতের আঁধারে এত জরুরি কাজ কেন, এটাই আমরা বুঝতে পারছি না।

এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই সামনে এসেছে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ ঠিকাদারি লাইসেন্স ভাড়ার। নথিতে দেখা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব মুহাম্মদ আমিনুল হক লিমিটেডের। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কাজ পরিচালনা করছেন নওগাঁ জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেন। এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ঠিকাদার ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো। তাদের দাবি, এটি মূলত লাইসেন্স ভাড়ার মাধ্যমে পরিচালিত একটি কাজ।

সূত্র জানায়, ২ থেকে ৩ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বেশ কিছু নেতা ওই লাইসেন্স ব্যবহার করছেন। সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, যিনি টেন্ডার পাবেন, তাকেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাজ সম্পন্ন করতে হয়। লাইসেন্স ভাড়া দিয়ে অন্যের মাধ্যমে কাজ করানো সরাসরি নিয়মবহির্ভূত। এ ব্যাপারে কথা বলতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আমিনুল হক ফোন ধরেননি। 

তাঁর ছোট ভাই এহসানুল হক মুন্নার ফোনে দুদিন ধরে বারবার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভালো সড়কে অপ্রয়োজনীয় কাজ বাছাই, তাড়াহুড়া করে রাতের বেলা কাজ করা এবং মাঠে ভিন্ন ঠিকাদারের উপস্থিতি- এসব কিছু মিলিয়ে প্রকল্পটি শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক অনিয়মের কারণে সড়ক বিভাগ দুই দফা কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। বর্তমানে সেই লাইসেন্স আবার কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হাজার কোটি টাকার কাজ, মন্ত্রীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও নানা অনিয়মের অভিযোগে ১৫ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই তালিকায় নওগাঁ জেলার বাসিন্দা আমিনুল হকের নামও রয়েছে।

বগুড়া সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুলতানা খানম এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সড়কটি সংস্কার করা দরকার ছিল। এই কাজ আরও আগে করতে পারলে ভালো হতো। তিনি দাবি করেন, কাজটি যথাযথভাবেই হচ্ছে। রাতে শুধু গর্ত পূরণের কাজ হচ্ছে। মূল কাজের সবকিছু হচ্ছে দিনের আলোয়। তিনি স্বীকার করেন, আমিনুল হক নিজে না করে জাকির হোসেন নামের একজন ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করাচ্ছেন।

তবে এ ব্যাপারে নওগাঁ জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, আমি কোনো কাজ করছি না। কেউ তাঁর নাম ভাঙিয়ে থাকতে পারে। এই কাজের ব্যাপারে আমার কোনো দায়বদ্ধতা নেই।

বগুড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল মুনসুর এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তথ্য চেয়ে আবেদন করার পরামর্শ দেন তিনি  ।

No comments