শিরোনাম

বগুড়ার চেলোপাড়া–নারুলীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ: ১২৯ আসামী, তবু গ্রেফতার শূন্য! পুলিশ কি অদৃশ্য চাপের মুখে?

ফয়সাল হোসাইন সনি, বগুড়া

বগুড়ার উত্তর চেলোপাড়া ও পশ্চিম নারুলীতে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং প্রকাশ্যে দা–সবল দিয়ে হত্যাচেষ্টার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো একজন আসামিকেও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। কিন্তু কেন?

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মাদক ব্যবসার আধিপত্য, দুই এলাকার অস্পষ্ট ক্ষমতার লড়াই, সামাজিক-অর্থনৈতিক বিরোধ—এবং সবচেয়ে আলোচিত বিষয়: কেউ যেন পুলিশকে আসামি ধরতে বাধা দিচ্ছে!

স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলছেন: “৪৯ জনের নাম, ১৭০ জন অজ্ঞাত—সবার বাড়ি-ঘর এলাকায়, সিসিটিভি ফুটেজ হাতে—তবু পুলিশ কেন কাউকে চেনেনা?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের অনুসন্ধান।

১. সংঘর্ষের সূত্র: মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ কে নেবে?

চেলোপাড়া–নারুলী এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ‘মাদক হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের মতে, দুই পক্ষের মধ্যে মাদক বিক্রির হিসাব, এলাকায় আধিপত্য, চাঁদাবাজি এবং পুরনো শত্রুতার জেরেই সংঘর্ষটি ঘটেছে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন— “যেখানে ইয়াবা–গাঁজা–ফেন্সিডিলের ব্যবসা চলে, সেখানে যে কোনো মুহূর্তে রক্ত ঝরতে পারে। বুধবার রাত থেকেই পরিবেশ গরম ছিল।” ২৩ অক্টোবর দুপুরে সেই উত্তেজনা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়।

২. সংঘর্ষ: দেশীয় অস্ত্র–অগ্নিসংযোগ–লুটপাট

২৩ অক্টোবর দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে টানা মারামারি চলে। অন্তত ২০টি ঘর-বাড়ি ও দোকান পুড়ে গেছে, লুট হয়েছে স্বর্ণ–টাকা–মালামাল। ফায়ার সার্ভিসের দুই ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে লড়াই করে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময়। ভুক্তভোগীদের মতে—“আগুন লাগার আগে লোকজন দোকানের শাটার ভেঙে যা পেয়েছে সব নিয়ে গেছে। আগুনটা ছিল লুটপাট ঢাকতে!”

৩. রবিনকে হত্যাচেষ্টা: চাইনিজ দা দিয়ে মাথায় কোপ—সিসিটিভিতে দেখা গেল মুখমণ্ডল!

উত্তর চেলোপাড়ার রবিন (২৫)কে যেভাবে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে, তা এক ধরনের প্রকাশ্য হত্যাচেষ্টা।

এজাহারে উল্লেখ— হাসান ও রাহুল মাথায় চাইনিজ দা দিয়ে কোপ দেয়। রাসেল, সাজাহান, সুমন, ভাবন, আপেল, রায়হানসহ আরও অনেকেই শরীরের বিভিন্ন স্থানে কোপায়। রবিনের ছোট ভাই হৃদয়কেও সাবল দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের অস্ত্র হাতে দৌড়াতে দেখা গেছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

চিকিৎসক জানিয়েছেন—“রবিনের মাথায় গভীর ক্ষত, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অবস্থা সংকটজনক ছিল।” রবিনের মা রোজিনা বেগম প্রশ্ন তুলেছেন—“যাদের নামে মামলা করেছি তাদের সবাই এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুলিশ কি অন্ধ?”

৪. দুই মামলায় ৪৯ জন নামীয় আসামি—তবু পুলিশ কেন ‘চিনে না’?

দুটি মামলায় নাম রয়েছে—

মামলা ১: রবিনকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ২০ জন।

মামলা ২: অগ্নিসংযোগ–লুট–সংঘর্ষে ২৯ জন, অজ্ঞাত: আরও ১৭০–১৮০ জন।

এতো নাম–ঠিকানা–সাক্ষী–সিসিটিভি—সব থাকার পরও তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জাহেদুর রহমান বলেন, “আমি আসামিদের কাউকেই চিনি না। তাই গ্রেফতার সম্ভব হয়নি।”

৫. পুলিশের ভূমিকায় প্রশ্ন?

কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন—সংঘর্ষের পরদিনও এলাকায় অভিযুক্তরা অবাধে চলাফেরা করেছে! কোনো ধরপাকড় হয়নি। বাদীরা বারবার পুলিশকে অনুরোধ করেছেন! স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ‘চাপ’ থাকার ইঙ্গিত মিলেছে।

একাধিক বাসিন্দা বলেন— “দুই এলাকাতেই রাজনৈতিক ছত্রছায়া আছে। পুলিশ আসলে কাকে ধরবে, কাকে ধরবে না—তা ঠিক করতে পারছেনা।”

৬. আমাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে—পুলিশের হাতে অন্তত ৩টি সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

একটিতে হামলাকারীদের হাতের অস্ত্র স্পষ্ট দেখা যায়। আরেকটিতে অগ্নিসংযোগের আগে ভিড় জমতে দেখা যায়। কিন্তু পুলিশ ফুটেজ দেখার পড়েও নীরবতা বজায় রেখেছে।

৭. এলাকায় আতঙ্ক–ভয়–নতুন সংঘর্ষের শঙ্কা-চেলোপাড়া–নারুলীতে এখনও সন্ধ্যার পর রাস্তায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। উভয়পক্ষের ঘরে ঘরে আতঙ্ক—আবার সংঘর্ষ বাঁধতে পারে।

পুলিশ–সেনাবাহিনীর টহল ছিল কয়েকদিন, তবে এখন তাদের আর দেখা মিলছে না।

কিন্তু ভুক্তভোগীরা বলছেন—“অভিযুক্তরা যদি ধরা না পড়ে, তাহলে আগুন–দা–সবল আবার নামবে।”

৮. কে দায়ী—কারা দুষ্কৃতকারী? অনুসন্ধানে তিনটি মূল কারণ? এই প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে তিনটি সম্ভাব্য কারণ—

(১) মাদক ব্যবসায় আধিপত্য–বিভাজন-দুই গ্রুপের মধ্যে কয়েক মাস ধরে টানাপোড়েন চলছিল।

(২) রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ-দুই পক্ষই স্থানীয়ভাবে ‘শক্তিশালী মহলের’ ছায়ায় রয়েছে বলে অভিযোগ।

(৩) পুলিশের নির্লিপ্ততা—বা অঘোষিত বাধা-মাঠপর্যায়ের পুলিশের বক্তব্য ওসি’র বক্তব্যের সঙ্গে মিলছে না।

৯. শেষ প্রশ্ন: আসামিরা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে—নাকি পুলিশ ধরতে চায় না?

দুই মামলায় মোট—৪৯ জন নামীয় আসামি, ১৭০–১৮০ জন অজ্ঞাত, সিসিটিভি ফুটেজ, ভুক্তভোগীর সরাসরি সাক্ষ্য, এলাকায় প্রত্যক্ষদর্শী।

এসব থাকার পরও ০ গ্রেফতার—এমন পরিস্থিতি প্রশ্ন তোলে—পুলিশের কার্যক্ষমতা? নাকি রাজনৈতিক চাপ? নাকি মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক এতই শক্তিশালী যে পুলিশও নড়তে পারছে না?

স্থানীয়দের একটাই দাবি—“অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করলে এই শহর আবারও জ্বলে উঠবে।”

No comments